নতুন ভোটারও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে

0
34
নতুন ভোটারও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে


স্টাফ রিপোর্টার :  করপোরেশন নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে নানা সমীকরণ। আগামী ১৫মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে নানা হিসাব-নিকাষ কসছে প্রার্থীরা। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সংখ্যালঘু, আঞ্চলিক ভোটার, শ্রমিক-বস্তিবাসী, হেফাজতের ভোটব্যাংকের পাশাপাশি বহু নতুন ভোটারও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে এ নির্বাচনে। তারাই নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন নগরপিতা। এসব ভোটারকে কাছে টানতে এরই মধ্যে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন দুই হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এবং বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। ভোটারদের মন জয় করতে চলছে বিরামহীন প্রচারণা।

দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন দুই দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতারাও। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তারা বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছে। কাকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন হবে তা নিয়ে হিসাব করছেন ভোটাররাও। গাজীপুরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে আলাপে এসব বিষয়ের কথা জানা গেছে।

ভোটাররা বলছেন, তারা চান নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। এক্ষেত্রে যিনি সুন্দর নগরী গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন-তাকেই মেয়রের আসনে বসাতে চান তারা। নতুন ভোটার, শ্রমিক, বস্তিবাসী, নারীসহ নানা পেশার ভোটারদের দাবিগুলোর কথা মাথায় রেখে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন দুই হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থী।

রিটার্নিং কার্যালয়ের তথ্যমতে গাজীপুর সিটিতে এবার নতুন ভোটার বেড়েছে এক লাখ ১০ হাজারের বেশি। তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পোশাক-কারখানার শ্রমিক। শিক্ষার্থীদের উল্লেখ্যযোগ্য অংশই আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়াও সিটির বিভিন্ন এলাকার কলকারখানার শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও নানা পেশায় জড়িতরা হয়েছেন নতুন ভোটার। ফলে এবারের সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে নতুন ভোটাররা হয়ে বড় ফ্যাক্টর। নতুন এই ভোটারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন মেয়র প্রার্থীরা।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এবং বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার উভয়েই এসব ভোটারদের মন জোগাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। গণসংযোগে নেমে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে তরুণ প্রজন্মের জন্য কে, কী করেছেন। শিক্ষিত ও সচেতন ভোটারদের নিজেদের দলে ভেড়াতে নানামুখী কৌশল নিচ্ছেন প্রার্থীরা।

নগরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্য নতুন ভোটার হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। নতুন ভোটার হতে পেরে তারা বেশ উচ্ছ্বসিত।

নতুন ভোটাররা জানান, জনগণের যিনি ভালো করবেন, রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন, জলবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম তেমন প্রার্থীদেরই ভোট দেবেন তারা।

শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের সমর্থন

গাজীপুর সিটির এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে ব্যবসায়ীদের সমর্থন। শিল্পাঞ্চল অধ্যূষিত গাজীপুরের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সমর্থন বড় ধরনের প্রভাব ফেলে সব নির্বাচনে। গাজীপুরের রাজনীতি সচেতনদের মতে, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের নীরব সমর্থন ঘুরিয়ে দিতে পারে ভোটের হিসাব-নিকাশ।

শ্রমিক ও বস্তিবাসী ভোটার

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল জেলা হওয়ায় শিল্প-কারখানায় চাকরির সুবাদে অন্য জেলার বহু লোকজন এ জেলায় এসে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। যাদের বেশিরভাগই পোশাক কারখানার কর্মী। এ সিটির ভোটারের মধ্যে সোয়া লাখের মতো শ্রমিক  ভোটার রয়েছে। ফলে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান ফ্যাক্টর বিবেচিত হয় শ্রমিক ভোটারদের। নির্বাচনে শ্রমিকদের ভোট পক্ষে টানতে নানা কৌশল ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দুই প্রধান মেয়র প্রার্থী। নির্বাচনী ইশতেহারে মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে শ্রমিকদের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান ও নানা কল্যাণমুখী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আলম শ্রমিকদের জন্য আটটি জোনে আবাসন ব্যবস্থাসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

আঞ্চলিক ভোটারদের মধ্যে বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীর মানুষই বেশি। গাজীপুরে জেলাগুলোর রয়েছে একাধিক সমিতি। ভোটের হাওয়া শুরু হওয়ার পর সক্রিয় হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক সমিতিগুলো। নির্বাচনকে সামনে রেখে উভয়দলই আঞ্চলিক ভোটারদের টানতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন।

উন্নয়ন বঞ্চনা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুর। সিটির উত্তরপ্রান্তে গাজীপুর ও দক্ষিণ প্রান্তে টঙ্গী দুই পৌরসভার সঙ্গে ছয়টি ইউনিয়ন যোগ করে গঠন করা হয়েছিল এ সিটি করপোরেশন। গাজীপুর সিটিবাসীর একদিকে যানজট অন্যদিকে জলাবদ্ধতা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তাটুকু দিনের বেশিরভাগ সময় যানজট লেগে থাকে। জয়দেবপুর রেলক্রসিংয়ের যানজট স্থবির করে দেয় গাজীপুর শহরবাসীর জীবনকর্ম। আবার একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় টঙ্গীসহ নগরীর বেশিরভাগ এলাকা। বাসন, কাশিমপুরসহ অন্তর্ভূক্ত ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকায় তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। এসব এলাকার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। এখনও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি প্রত্যন্ত এলাকায়। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই কাঁদা এবং পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তাগুলো। এছাড়া অনেক এলাকায় গ্যাস সংযোগ নেই। এ উন্নয়ন বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ আছে নগরবাসীর। আর এ ক্ষোভ ভোটের মাঠে অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে বলে অনেকে মনে করে।

আলেম-ওলামা ও ইসলামী দল

গাজীপুরের নির্বাচনে আলেম-ওলামা ও ইসলামী দলগুলো অন্যত বড় ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়াবে। গাজীপুরে জামায়াত এবং হেফাজতের ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিগত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পাশে পাননি আলেম-ওলামা ও হেফাজতের সমর্থন। এ কারণে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকেই হেফাজতের আমির আল্লামা শফীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোয়া নিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। তবে হেফাজতের একটি অংশ বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে রয়েছে বলে দাবি বিএনপির।

সংখ্যালঘু ভোট

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম ফ্যাক্টর সংখ্যালঘুদের ভোট। কারণ এই সিটিতে সংখ্যালঘুদের ভোট আছে প্রায় সোয়া লাখের মতো। অতীতে তাদের ঝোঁক ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে। এবারও তারা আওয়ামী লীগকে বেছে নেবে দাবি করছেন মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। ইতিমধ্যে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনও জানিয়েছেন গাজীপুরের সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলোর একাংশ। কিন্তু বিগত নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যূষিত এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল আশাব্যঞ্জক। আসন্ন নির্বাচনে সে ধারাবাহিকতায় সংখ্যালঘুদের ভোটে বড় ধরনের ভাগ বসাতে চায় বিএনপি। সংখ্যালঘুদের ভোট আদায়ে নানা কৌশলে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। তার কর্মী-সমর্থকরা সংখ্যালঘুদের মন জয় করতে নানা কৌশলে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলেরই সমর্থক রয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে। ফলে সিটি নির্বাচনে তাদের ভোট দুই ভাগেই পড়বে।

খালেদার মুক্তি ও জাতীয় নির্বাচন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একে তো জাতীয় নির্বাচনের বছর তার ওপর বিএনপি চেয়ারপারসন  বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাগারে। বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতা ও সমর্থকরা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে জোরদার করতে ধানের শীষে ভোট চাইছেন। ফলে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে সিটি নির্বাচনে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় ইস্যু কোন গুরুত্ব বহন করে না বলেই মনে করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। উল্লেখ্য, আয়তনের দিক দিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এই সিটির ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৫ জন।



Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here